Royalbangla
রয়াল বাংলা ডেস্ক
রয়াল বাংলা ডেস্ক

গর্ভকালীন সময়ে গর্ভবতী মায়ের যত্ন

মা ও শিশু

গর্ভধারণ যে কোন নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নতুন প্রাণের আগমনের খবর উচ্ছ্বসিত করে তোলে যেকোন নারীকে। গর্ভধারণ করার পর কি করতে হবে, শারীরিক পরিবর্তন কী হচ্ছে, কী হতে পারে এমন অনেক বিষয় সম্পর্কে অনেকের অজানা থাকে । তাই সুস্থ গর্ভধারণ ও সুস্থ শিশু জন্মদানের জন্য গর্ভবতী মায়ের যত্ন সম্পর্কে আমাদের সকলের অবগত থাকা একান্ত জরুরী। ১. ডাক্তারের সাথে পরামর্শ:
সন্তান নেয়ার ইচ্ছা থাকলে আপনি আগে থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। যাতে আপনার শারীরিক বিষয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পারেন। আর গর্ভধারণের শুরু থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন। যাতে আপনার অনাগত সন্তানের জন্মপূর্ব যত্নের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রয়োজন মত ঔষধ খাওয়া, মেডিকেল টেস্টগুলো, টিকা নেয়া এসব করতে হবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী। সর্বোপরি শুরু থেকেই যদি ডাক্তারের পরামর্শ অনুসরণ করা হয় তাহলে গর্ভাবস্থায় সুস্থ থাকা সম্ভব।
২. পরিমিত আদর্শ খাবার গ্রহণ:
অনেকেই মনে করেন গর্ভাবস্থায় মা কে দুই জনের খাবার একসাথে খেতে হবে। ধারণাটি ভুল। প্রথম তিন মাস স্বাভাবিক এবং পুষ্টিকর খাবারই মায়ের জন্য যথেষ্ট। এর পর থেকে ২০০ থেকে ৩০০ ক্যালরি খাবার বেশি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে শিশু অপুষ্টিতে ভুগবে। গর্ভবতী মায়ের খাদ্য তালিকায় সুষম খাবার যথেষ্ট পরিমাণে থাকতে হবে। রুটি আর ভাত হচ্ছে আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য। এক্ষেত্রে লাল চাল অথবা লাল আটার রুটি গর্ভবতী মায়ের জন্য ভাল। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে। ভ্রূনের বৃদ্ধির জন্য প্রচুর ক্যালসিয়াম দরকার হয়। দুধে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। কোষ্টকাঠিন্য থেকে রক্ষা পেতে হলে শাক-সবজি র কোন বিকল্প নেই। তাই প্রতিদিনের খাবার তালিকায় শাক-সবজি থাকা বাঞ্ছনিয়। ভিটামিন এ, বি, সি, ডি ও কে গর্ভবতী মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিন গুলো দুধ, মাখন, ডিম, ছানা, কডলিভার অয়েল, ইলিশ মাছ, টমেটো, গাজর, পালং শাক, বিট, লালশাক বিভিন্ন ধরনের ডাল, আলু ইত্যাদি থেকে পাওয়া যাবে। আর প্রতিদিন কয়েক রকমের ফল খেতে হবে।
৩. ফুডহাইজিনের বিষয়ে সতর্কতা:
কিছু খাবার আছে যা গর্ভাবস্থায় খাওয়া একদমই ঠিক না। লিস্টেরিওসিস এক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি যা লিস্টেরিয়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়ে থাকে। গর্ভাবস্থায় এই ব্যাকটেরিয়া শিশুর জন্মগত জটিলতা সৃষ্টি করে, এমনকি গর্ভপাতও ঘটাতে পারে। যেকোন ধরনের মগজ, অপাস্তুরিত দুধ, ভালো করে রান্না না করা খাবার, নরম ও ছিতি পড়া পনির ইত্যাদি খাবার গুলো জন্মগত জটিলতার সৃষ্টি করে। এছাড়াও পরিপূর্ণ সিদ্ধ না করা ডিম, কলিজা, মধু, আনারস, পেঁপে, সজনে ডাটা, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় থেকে বিরত থাকতে হবে। তা না হলে মা ও ভ্রূণ উভয়েরই স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
৪. সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ:
প্রেগনেন্সির সময় ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট সুষম খাদ্যের বিকল্প নয়। যদি গর্ভবতী মা ঠিক মত খাবার গ্রহণ করতে না পারেন এবং অনেক বেশি অসুস্থ থাকেন তাহলে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করা আবশ্যক। মায়ের স্বাস্থ্য বুঝে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি, বি, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে।
৫. নিয়মিত শরীর চর্চা:
গর্ভাবস্থায় নিয়ম মেনে অল্প কিছু সময় ব্যায়াম করা উপকারী। অনাগত সন্তানের কথা ভেবে হলেও গর্ভবতী মাকে নিয়ম মেনে কিছু ব্যায়াম করতে হবে। তবে এ সময়ের ব্যায়াম অন্য সময়ের মত নয়। এ সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যায়াম করা উচিত। কোন ধরনের ভারি ব্যায়াম করা যাবে না। ব্যায়াম শুরু করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থা ব্যায়ামের জন্য উপযুক্ত কিনা। মায়ের শারীরিক অবস্থানুযায়ী, প্রয়োজন, বয়স, পরিবেশগত সুবিধা, সময়ের সীমাবদ্ধতা ও মানসিক প্রবণতার কথা ভেবে ব্যায়াম বেছে নেয়া ভালো। তবে প্রসূতি বিদ্যায় অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ মত ব্যায়াম করা শ্রেয়।
৬. মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা:
গর্ভকালীন সময়ে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের পরিমাণ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় তাহলে এর ক্ষতিকর প্রভাব বাচ্চার উপর পড়ে। বিষন্নতা একটি রোগ। ৩০ শতাংশেরও বেশি নারী গর্ভাবস্থায় বিষন্নতার শিকার হয় এবং তারা নিজেরাই স্বীকার করতে চান না তার বিষন্নতার কথা। মনে রাখতে হবে, দৈহিক সুস্থতার সাথে মানসিক সুস্থতাও জরুরী। বিষন্নতা বা মানসিক সমস্যা চিকিৎসা ছাড়া ভাল হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কাজেই গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি মনে হয় বিষন্নতায় ভুগছেন তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরী।
৭. ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন:
অ্যালকোহল অতি সহজেই নাড়ি বা প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর শরীরে পৌঁছাতে পারে এবং এতে করে মিস কারেজ হতে পারে। অন্যদিকে ধুমপান করলে শিশুর কম ওজন, প্রি ম্যাচিউর বার্থ, গর্ভেই শিশুর মৃত্যু বা জন্মের সময় শিশুর মৃত্যুর মত ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গর্ভকালীন সময়ে অ্যালকোহল ও ধুমপান থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এছাড়াও চা, কফি, কোলা বা যে কোন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস এ প্রচুর পরিমাণে ক্যাফেইন থাকে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন এর প্রভাবে শিশুর ওজনের ঘাটতি দেখা দেয়। গর্ভাবস্থায় এসব থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
৮. বিশ্রাম
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গর্ভবতী নারী উচ্চ মাত্রার প্রেগনেন্সি হরমোনের কারনে কিছু অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যায়। যেমন- রাতে ভাল ঘুম না হওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, অবসাদ, অল্পতেই ক্লান্তি এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্রাম নিতে হবে। বিভিন্ন রকম ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৯. ত্বক ও দাঁতের যত্ন:
এ সময় ত্বকের পরিবর্তন কিছুটা লক্ষ্য করা যায়। বুকে, পেটে, উরুতে, পিছন দিকটায় স্ট্রেচ মার্ক দেখা দিতে পারে। তাই এই জায়গাগুলোতে লোশন, অলিভ অয়েল মাখা যেতে পারে। এতে চুলকানি কমবে এবং দাগের প্রভাবও কিছুটা কমবে। এ সময় অনেকেরই দাঁতের বিভিন্নরকম সমস্যা যেমন- দাঁত থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দেয়। দাঁতে সমস্যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাঁধাগ্রস্থ করে। ফলে প্রিম্যাচিউর বাচ্চার জন্ম হতে পারে। এজন্য কমপক্ষে দিনে দুই বার দাঁত ব্রাশ করা উচিৎ। বেশি সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
১০. বিবেচ্য বিষয়:
গর্ভাবস্থায় একটু ধৈর্য ধারন করতে হবে। নারী যেমন মা হচ্ছে তেমনি পুরুষও বাবা হচ্ছে। সঙ্গমের ক্ষেত্রে একটু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। ভ্রমনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। দীর্ঘ্য ভ্রমনের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে গর্ভের সন্তান নিরাপদ ও সুস্থ থাকে। গর্ভাবস্থায় যে কোন বিপদ চিহ্ন দেখলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। মা সুস্থ্য থাকলে একটি সুস্থ্য সন্তানের জন্ম হবে। তাই উপরের টিপসগুলো অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তবেই মা ও শিশু উভয়ই ভাল থাকবে। সবার জন্য শুভকামনা রইল।
আরও পড়তে পারেন। নবজাতকের যত্ন কিভাবে নেবেন
  1. royalbangla.com এ আপনার লেখা বা মতামত বা পরামর্শ পাঠাতে পারেন এই এ‌্যড্রেসে royal_bangla@yahoo.com
পরবর্তী পোস্ট

জেনে নিন থাইরয়েড সমস্যায় ওষুধ খাওয়ার সঠিক নিয়ম



আক্কেল দাঁত কখন এবং কেন ফেলতে হয়?

ডা: এস.এম.ছাদিক,ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারী
সাধারণত আক্কেল দাঁত সম্পূর্ণভাবে উঠার সময় হলো ১৭-২৫ বছর বয়স । কিন্তু ১৭-২০ বছর বয়সের মধ্যেই বুঝা যায় আক্কেল দাঁত সঠিকভাবে উঠবে কি না।....
বিস্তারিত

শালগম এর উপকারীতা

পুষ্টিবিদ মোঃ ইকবাল হোসেন,পুষ্টি কর্মকর্তা
শালগম অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে সুপরিচিত। ভিটামিন এ, সি এবং ভিটামিন কে তে ভরপুর থাকে শালগম। শালগমের সবচাইতে ভালো দিক হচ্ছে এদের ক্যালরি খুব কম থাকে। নিয়মিত শালগম খাওয়ার কিছু কারণ সম্পর্কে জেনে নিই চলুন।........
বিস্তারিত

সাইনাস আর সাইনুসাইটিস, আসুন সহজে বুঝে নিই.

ডা: এস.এম.ছাদিক,ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারী
স্বাভাবিক নিশ্বাস নিতে মনে হয় নাকে কি যেনো আটকে আছে,, আবার নাক দিয়ে পানিও পড়ে। গায়ে হালকা জ্বর ও আছে, আবার সাথে মাথা ব্যাথা। তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন, ডাক্তার বললেন, আপনার সাইনুসাইটিস হয়েছে,........
বিস্তারিত

গর্ভাবস্থায় কি চা-কফি পান করা যায়?

ডাঃ সরওয়াত আফরিনা আক্তার (রুমা) ,Consultant Sonologist
চা ও কফি আপনাদের অনেকেরই প্রছন্দের পানীয়। তাই গর্ভাবস্থায়ও খেতে চান, তাই না? এ ক্ষেত্রে আমাদের জানা উচিত এই পানীয় পান করা যাবে কি না, গেলে কতটুকু করা যাবে।......
বিস্তারিত

বাচ্চাদের ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলবেন কিভাবে?


পুষ্টিবিদ মোঃ ইকবাল হোসেন।বিএসসি (সম্মান), এমএসসি (প্রথম শ্রেণী) (ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি)

মহিলাদের ইনফার্টিলিটি দূর করার ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর গুণাগুণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?


ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (অবস এন্ড গাইনী)

কিডনী সিস্ট কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ?


ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম আলী,এম.বি.এস,বিসিএস (স্বাস্থ্য) ,এমএস (ইউরোলজি)

শিশুদের ডায়েট কেমন হওয়া উচিত ?


নিউট্রিশনিস্ট সুমাইয়া সিরাজী,Bsc (Hon's) Msc (food & Nutrition)

লিভারের সুস্থতায় কি করবেন?


নুসরাত জাহান, ডায়েট কনসালটেন্ট

অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণ , চিকিৎসা ও ঘরোয়া প্রতিকার


ডাঃ হাসনা হোসেন আখী