Royalbangla
ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (অবস এন্ড গাইনী)
ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (অবস এন্ড গাইনী)

জরায়ুর মুখে ক্যান্সার

মেয়েলি সমস্যা

মহিলাদের জরায়ুর মুখে যে ক্যান্সার হয় তাকে জরায়ুর ক্যান্সার বলে । এই ক্যান্সার অত্যন্ত মারাত্মক যা বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যপী মহিলাদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারন । জরায়ুর ক্যান্সার সাধারনত ৩০ থেকে ৫৫ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে বেশী হয়ে থাকে । বয়স্ক ও দরিদ্র মহিলারা জরায়ু ক্যান্সারের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকি পূর্ণ ।

যে কোনো বয়সেই নারীদের এই জরায়ু ক্যান্সার হতে পারে, তবে ২০ বছরের কম বয়সীদের এ রোগ সাধারণত হয় না । কিন্তু বাল্য বিবাহ হলে বা ২০ বছরের আগে সন্তান ধারণ করলে এই মরন ব্যাধি দেখা দিতে পারে ।

একদিন বা একমাসে হঠাৎ করে জরায়ু-মুখে ক্যান্সার হয় না । জরায়ু মুখ আবরণীর কোষগুলোতে বিভিন্ন কারণে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ক্যান্সারের রূপ নেয় । স্বাভাবিক কোষ থেকে জরায়ু মুখের ক্যান্সার হতে প্রায় ১০-১৫ বছর সময় লাগে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার দ্বারা শতকরা ১০০ ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যেতে পারে ।

রোগের শুরুতে উপসর্গ বা লক্ষণ গুলো অল্পমাত্রায় থাকে দেখে একে কেউ গুরুত্ব দিতে চান না । এজন্য রোগীদের পক্ষে অনেক সময়ই প্রাথমিক পর্যায়ে আসা সম্ভব হয়না । আমাদের দেশে জরায়ু-মুখ নিয়মিত পরীক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা এখনও গড়ে উঠেনি । এর ফলে জরায়ু-মুখ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে শতকরা ৮০ ভাগ রোগীরা আসেন শেষ পর্যায়ে এবং ইতিমধ্যে ক্যান্সার ছড়িয়ে যায় এবং অপারেশন করা আর সম্ভব হয় না । সাময়ীক ভাবে জীবন বাঁচায়ে রাখতে বড় ধরনের অপারেশন প্রয়োজন হয় কিন্ত তাতেও পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়না ।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের কারণ ঃ

মূল কারণ না জানা গেলেও নিম্নোক্ত কারণ সমূহকে জরায়ু ক্যান্সারের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয় -

- ২টি বয়সে বেশি দেখা যায় ৩৫ বছরে এবং ৫০-৫৫ বছরে ৷

- অল্প বয়সে বিয়ে হলে (১৮বছরের নিচে) বা যৌন মিলন করে থাকলে ।

- ২০বছরের নিচে গর্ভধারণ ও মা হওয়া ।

- অধিক ও ঘনঘন সন্তান প্রসব ।

- বহুগামিতা (একাধিক পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক) ।

- স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং জননাঙ্গের অপরিচ্ছন্ন অবস্থা ।

- ঋতুস্রাবের সময়কালে ব্যবহৃত দুষিত কাপড় বা অপরিচ্ছন্নতা ।

- বিভিন্ন রোগ জীবাণু দ্বারা জরায়ু বারে বারে আক্রান্ত হলেও জরায়ু ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেশি থাকে, যেমন - Human papilloma Virus (হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস) (HPV-16, 18) ।

- দীর্ঘ সময়ব্যাপী (৫ বছরের বেশি সময়কাল ধরে ) জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খেলে ।

- ধূমপান বা অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করলেও এই ক্যান্সার হতে পারে ।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের লক্ষণ ঃ

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের লক্ষণ নাও থাকতে পারে । তবে নিচের লক্ষণগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়-

- অনিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়া ।

- মাসিকের সময় রক্তপাতের পরিমান স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদী হওয়া ।

- দুই মাসিক এর অন্তর্বর্তী সময়ে হালকা রক্তপাত হওয়া ।

- মাসিক বন্ধ হবার পরও মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্তপাত হওয়া ।

- ঋতু সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ১ বছর পরেও রক্তস্রাব দেখা যাওয়া ।

- যৌনসঙ্গমের পর রক্তস্রাব হওয়া অর্থৎ সহবাসের পরে রক্তপাত হওয়া ।

- যৌনসঙ্গম বা সহবাসের পরে ব্যথা অনুভূত হওয়া ।

- নিন্মাঙ্গের চারপাশে চাপ লাগা কিংবা ঘন ঘন মূত্রত্যাগ করা ।

- যোনিপথে বাদামি অথবা রক্তমিশ্রিত স্রাবের আধিক্য দেখা দেওয়া ।

- সাদা দুর্গন্ধযুক্ত যোনিস্রাব হওয়া ।

এছাড়াও গ্যাস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য হালকা খাবারের পর পেট ভর্তি লাগা, পেটে অস্বস্তি লাগা ইত্যাদি পেটের কোনো সমস্যা খুব বেশি হলে তা জরায়ু ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে, অন্য সময়ের থেকে পেটে অনেক পরিবর্তন দেখা দেওয়া, পেটে অতিরিক্ত ব্যথা কিংবা পেট ফুলে থাকা, বমি বমি ভাব কিংবা বার বার বমি হওয়া, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা ওজন অনেক বেশি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করা, নারীদের মেনোপজ হওয়ার পরেও ব্লিডিং হওয়া ।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের রোগ নির্ণয় ঃ

জরায়ুর মুখে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের Screening Test রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম টেস্ট হচ্ছে -

Cancer of the cervix in Bangla

- পেপস স্মেয়ার টেস্ট (Pap Smear Screening Test)

- VIA (Visual Inspection with Acetic Acid) Test

যে কোনো একটি টেস্ট করার মধ্যমে খুব সহজে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব । সকল সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক, মেরিস্টোপস্ ক্লিনিকে পরীক্ষাটি বিনামূল্যে করানোর সুযোগ রয়েছে।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসা ঃ

- প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎকের পরামর্শ অনুসারে চললে সম্পূর্ণ ভালো হওয়া যায়।

- মধ্য পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে অপারেশনের মাধ্যমে জরায়ু কেটে বাদ দেওয়া যেতে পারে৷

- কিন্তু দেরী হয়ে গেলে রোগ ছড়িয়ে পরলে সার্জারি এবং কেমোথেরাপি বা রেডিও থেরাপি দিয়ে চিকিৎসা দিয়ে রোগিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। তবে এই কেমোথেরাপি এবং রেডিও থেরাপি অনেক ব্যায় বহুল ।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের প্রতিরোধ ঃ

রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে প্রতিরোধ অর্থাৎ রোগটা হতে না দেওয়ার জন্য আমাদের যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন -

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারের প্রতিরোধক টিকা গ্রহণ করা । তবে টিকা গ্রহণ করার আগে অবশ্যই রোগ নির্ণয়ের জন্য সর্ব প্রথম VIA Test বা Pap Smear Test করতে হবে । কারণ ক্যান্সার হয়ে যাওয়ার পর টিকা দিলে কোনো কাজে আসে না বা ক্যান্সারের গতিরোধ করতে পারে না ।

বিয়ে বা যৌন সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই এই টিকা নেয়া উচিত কারণ এইচপিভি ইনফেকশনে জরায়ুতে পরিবর্তন হতে শুরু করলে টিকা তা দমন করতে পারে না ।

প্রতি তিনবছর অন্তর স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে জরায়ু-মুখ অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে ।

৩০ বছরের বেশি বয়স হলেই জরায়ু-মুখ অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে৷ তবে ১৮ বছরের পূর্বে এবং বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে ২৫ বছর বয়স হলেই জরায়ু মুখ পরীক্ষা করাতে হবে ।

সহবাসের সময় কনডম ব্যবহারের মাধ্যমে জরায়ুর ক্যান্সারের জন্য দায়ী (HPV) এর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা যায় ।

গর্ভাবস্থায় এ টিকা নেয়া যায় না ।

এ টিকা গ্রহণকারীকেও নিয়মিত জরায়ু মুখ পরীক্ষা করাতে হবে।

জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধক টিকা ঃ

জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের টিকা দেশের সকল বড় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়াও বিভিন্ন ক্লিনিকেও পাওয়া যায় । নিকটস্থ গাইনি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এই টিকা গ্রহণ করা যেতে পারে ।

সারভারিক্স (Cervarix Vaccine) [যা HPV - 16 ও 18 - এর প্রতিরোধক টিকা] - দাম প্রতি ডোজ ২৫০০ টাকা ।

গার্ডাসিল (Gardasil Vaccine) [যা HPV - 6, 11, 16 ও 18 - এর প্রতিরোধক টিকা] - দাম প্রতি ডোজ ৩৫০০ টাকা ।

নিয়মানুযায়ী ৯-২৫ বছর বয়সে এ টিকা দিলে সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয় ।

এই টিকা হাতের মাংসপেশিতে দিতে হয় । তিনটি ডোজ টিকা নিতে হয়।

সারভারিক্স (Cervarix Vaccine) টিকা নেবার ক্ষেত্রে - ১ম ডোজ নেবার ১ মাস পর ২য় ডোজ এবং ৬ মাস পর ৩য় ডোজ নিতে হয় ।

গার্ডাসিল (Gardasil Vaccine) টিকা নেবার ক্ষেত্রে - ১ম ডোজ নেবার ২ মাস পর ২য় ডোজ এবং ৬ মাস পর ৩য় ডোজ নিতে হয়।

এই লেখকের সব লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে।
www.royalbangla.com/dr.hasnahossain

লেখক
ডাঃ হাসনা হোসেন আখী
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমএস (অবস এন্ড গাইনী)
ট্রেইন্ড ইন ল্যাপারস্কপি এন্ড ইনফার্টিলিটি স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিদ্যা বিশেষজ্ঞ এবং ল্যাপারস্কপিক সার্জন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
নিয়মিত রোগী দেখছেন: মার্কস কনসালটেশন সেন্টার।
প্রতিদিন : বিকেল ৫ টা হতে রাত ৮ টা পর্যন্ত।
সিরিয়াল : 01729-269437.
সিরাজ মার্কেট (২য় তলা), কচুক্ষেত, ঢাকা-১২০৬। (ফুট ওভার ব্রিজের পাশে)
লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে নিচের ফেসবুক পেইজে ক্লিক করুন
www.facebook.com/dr.hasnahossain

  1. royalbangla.com এ আপনার লেখা বা মতামত বা পরামর্শ পাঠাতে পারেন এই এ‌্যড্রেসে [email protected]
পরবর্তী পোস্ট

নরমাল ডেলিভারির জন্য টিপস


.

লিউকোরিয়া শ্বেতপ্রদর সাদাস্রাবের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা।


ডাঃ আয়েশা রাইসুল (গভঃ রেজিঃ H-১৫৯৮)
.

মেয়েদের যৌনাঙ্গে ইচিং বা চুলকানি


ডাঃ আয়েশা রাইসুল (গভঃ রেজিঃ H-১৫৯৮)
.

আমি কেন সবসময় অসুস্থ থাকি?


Nusrat Jahan
.

দাম্পত‌্য জীবনে সুখী হওয়ার ডায়েট


Dietitian Shirajam Munira
.

মেয়েদের মুখের অবাঞ্চিত লোম!


ডা. মো মাজহারুল হক তানিম
.

জরায়ু মুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকা


ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য) এমএস (অবস এন্ড গাইনী)
.

মেয়েদের প্রস্রাবের সংক্রমণ


ডাঃ হাসনা হোসেন আখী
.

ব্রেস্ট এ সিস্ট কি বিপদজনক?


ডাঃ লায়লা শিরিন
.

গর্ভবতী মহিলা কি কোভিড টীকা নিতে পারবেন ?


ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (অবস এন্ড গাইনী)
.

স্তনের চাকা এবং ক্যান্সার আতংক


ডাঃ লায়লা শিরিন,সহযোগী অধ্যাপক, ক্যান্সার সার্জারী, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল

বুকে ধড়ফড় করে?? কি করবেন??

ডা: অনির্বাণ মোদক পূজন,হৃদরোগ, বাতজ্বর ও উচ্চ রক্তচাপ রোগ বিশেষজ্ঞ
একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে। এ সমস্যাটি বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বুক ধড়ফড় করলে সবাই ভয় পেয়ে যান।আবার অনেকে মনে করেন ভয় পেলেই এমনটা হয়। ........
বিস্তারিত

কোলেস্টেরল কি ? কিভাবে ক্ষতি করে?

ডা. মুহম্মদ মুহিদুল ইসলাম,সায়েন্টিফিক অফিসার
আমাদের শরীর যদি একটা ছোট্ট শহর হয় তবে এই শহরের প্রধান সমাজবিরোধী হচ্ছে 'কোলেষ্টেরল।' এর সাথে কিছু সাঙ্গ পাঙ্গ আছে। তবে একেবারে ডানহাত 'ট্রাইগ্লিসারাইড।'.................
বিস্তারিত

ড্রিপ্রেশন ম্যানেজমেন্টে পরিবার বা প্রিয়জনের ভূমিকা

জিয়ানুর কবির,ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিষ্ট
ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় মেডিসিন ও সাইকোথেরাপী দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বিষন্নতার মাত্রা অল্প হলে শুধুমাত্র সাইকোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যায়।....
বিস্তারিত

ডায়াবেটিক পেশেন্ট কি উপায়ে তরমুজ খাবেন

পুষ্টিবিদ মুনিয়া মৌরিন মুমু
ঋতু হিসেবে গ্রীষ্মকাল অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে। গ্রীষ্মকালের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মৌসুমে পুষ্টিগুণে ভরপুর সব মুখরোচক ফল .....
বিস্তারিত