Royalbangla
ডাঃ গুলজার হোসেন
ডাঃ গুলজার হোসেন

আসুন থ্যালাসেমিয়াকে জানি

টিপস

আমাদের রক্ত কেন লাল? কারণ, আমাদের রক্তে লোহিত রক্তকণিকা থাকে। এখানে হিমোগ্লোবিন নামে বিশেষ ধরনের রঞ্জক পদার্থও থাকে। এই হিমোগ্লোবিনের কাজ কী? হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করা।থ্যালাসেমিয়া বলে এক ধরনের বংশগত রোগ আছে। এটি শরীরে বিশেষ ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লেবিন তৈরি করে। স্বাভাবিক লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল ১২০ দিন।

ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের কারণে অথবা বলা যায় হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল কমে যায় এবং লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায়। এ অবস্থায় অস্থিমজ্জার পক্ষে একই হারে লোহিত কণিকা তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। সেখান থেকে দেখা দেয় নানা রকম উপসর্গ। এই হলো থ্যালাসেমিয়া।

থ্যালাসেমিয়া অনেক রকমের আছে। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনেরও রকমফের আছে। তবে মোটামুটিভাবে বলা যায়, থ্যালাসেমিয়া প্রধাণত দুই প্রকার—আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া।

বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলফা থ্যালাসেমিয়া তীব্র হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এর উপসর্গও বোঝা যায় না, রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া দুই রকমের হতে পারে। একটি বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর। এদের থ্যালসেমিয়া ট্রেইট বা ক্যারিয়ার বলে। অপরটি থ্যালাসেমিয়া মেজর।

থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট আর থ্যালাসেমিয়া এক নয়। কারণ, এরা মূলত রোগটির বাহক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের শরীরে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেকে হয়তো অজান্তেই সারাজীবন এই রোগ বহন করে চলে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে মৃদু রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।বাবা ও মা উভয়ে থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট হলে ভূমিষ্ঠ শিশুর শতকরা ২৫ ভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়।

উপসর্গ

থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গগুলো মূলত রক্তস্বল্পতার কারণে সৃষ্ট উপসর্গ। অর্থাৎ ক্লান্তি, অবসাদগ্রস্ততা, শ্বাসকষ্ট, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া এসব। রক্ত অধিক হারে ভেঙে যায় বলে জন্ডিস হয়ে ত্বক হলদে হয়ে যায়। প্রস্রাবও হলুদ হতে পারে। প্লীহা বড় হয়ে যায়। যকৃতও বড় হয়ে যেতে পারে। অস্থি পাতলা হয়ে যেতে থাকে। চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয়। নাকের হাড় দেবে যায়। মুখের গড়ন হয় চীনাদের মতো। একে বলে 'মংগোলয়েড ফেইস '। আস্তে আস্তে দেখা দেয় বিশেষ কিছু জটিলতা।

রোগীকে ঘনঘন রক্ত দিতে হয় বলে শরীরে আয়রনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এই আয়রন জমা হয় হৃৎপিণ্ডে, যকৃতে, অগ্ন্যাশয়ে। এই পর্যায়টি মারাত্মক। দেখা যায়, অতিরিক্ত আয়রন জমে যাওয়ার কারেণে অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। এ রকম পরিস্থিতিতে সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগী মারা যেতে পারে। বারবার রক্ত পরিসঞ্চালনের কারণে রোগীরা সহজেই রক্তবাহিত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত করার উপায় হলো রক্তের হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস পরীক্ষা। রক্তের রুটিন পরীক্ষা করলে রক্তস্বল্পতার মাত্রা বোঝা যায়। এ ছাড়া এই রোগে লোহিত কণিকার আকার ছোট হয়ে যায়। রুটিন পরীক্ষায় সেটাও বোঝা যায়। এতে প্রাথমিক সন্দেহটা এখান থেকেও আসতে পারে। এ ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা করেও এই রোগ ধরা যায়। মাথার এক্স-রে, পেটের আলট্রাসনোগ্রাম এগুলোও আছে।

চিকিৎসা

রক্ত পরিসঞ্চালনই থ্যালাসেমিয়ার মূল চিকিৎসা। আয়রন বেড়ে গেলে ওষুধের মাধ্যমে তা কমাতে হবে। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার বা আয়রনের ওষুধ খাওয়া একদম নিষেধ। প্লীহা বড় হয়ে গেলে অপারেশন করে সেটা ছোট করে দিতে হয়। এতে রক্ত গ্রহণের হার কিছুটা কমে আসে। মূলত অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন হলো এর স্থায়ী চিকিৎসা। এটা খুবই ব্যয়বহুল।

পরিসংখ্যান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ১০ কোটির বেশি লোক বিভিন্ন ধরনের বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। প্রতিবছর প্রায় এক লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে।বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বাংলাদেশে ৪৮ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। ৩ শতাংশ লোক বিটা থ্যালাসেমিয়ার বাহক, ৪ শতাংশ অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন রোগের বাহক। প্রতিবছর ছয় হাজার শিশু বিভিন্ন রকমের থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা খুব জরুরি। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া অনেকখানি কমানো যেতে পারে। দুজন ক্যারিয়ারের মধ্যে যেন বিয়ে না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে পারলে থ্যালাসেমিয়া কমানো সম্ভব। আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে করা যাবে না। ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে বাচ্চা পেটে আসার পর চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ উপায়ে গর্ভস্থ শিশুর থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করতে হবে। রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাবরশন করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ উপায়ে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ কমানো গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে, আগামী ৫০ বছরে থ্যালাসেমিয়া পৃথিবীজুড়ে একটি বড় রকমের সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। এটি রোধে ব্যাপক সচেতনতা দরকার। সরকারি, ব্যক্তিগত, সামাজিক, গণমাধ্যম সব দিক থেকেই এই সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। তবেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

এই লেখকের সব লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে।
www.royalbangla.com/gulzarhematologist

লেখক

ডাঃ গুলজার হোসেন
বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
চেম্বারঃ
বি আর বি হাসপাতাল পান্থপথ, ঢাকা।
লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে নিচের ফেসবুক পেইজে ক্লিক করুন
www.facebook.com/gulzarhematologist

  1. royalbangla.com এ আপনার লেখা বা মতামত বা পরামর্শ পাঠাতে পারেন এই এ‌্যড্রেসে royal_bangla@yahoo.com
পরবর্তী পোস্ট

অতিরিক্ত চিনি খেয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন না তো???


.

আপনি কি নিজের অজান্তে আয়রন এর অভাবে ভুগছেন ?


পুষ্টিবিদ জয়তী মুখার্জী
.

থ‌্যালাসেমিয়া কি ? কেন হয় ?


ডাঃ সাঈদ সুজন
.

রক্ত কখন কেন কিভাবে দিবেন?


ডাঃ সাঈদ সুজন
.

রক্তদানের ১০টি উপকারিতা যা জানলে আপনি অবাক হবেন


ডা ফাতেমা জোহরা
.

রক্তশূণ্যতা কী? কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার।


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

প্রসংগ:ব্লাড ক্যান্সার-প্রাথমিক ধারনা ও করণীয়


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

রক্তদান ও রক্তপরিসঞ্চালন নিয়ে কিছু কথা


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

ডেংগি ও প্লেইটলেট(ডেংগু নিয়ে কিছু ভ্রান্ত আতঙ্ক)


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

আসুন থ্যালাসেমিয়াকে জানি


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

বাবার জন্য সন্তানের রক্ত কতটুকু নিরাপদ?


ডাঃ গুলজার হোসেন,বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল

কমসময়ে ঘরে তৈরি রেস্তোরাঁ স্টাইলে ছোট মাছের চচ্চড়ি

পুষ্টিবিদ মুনিয়া মৌরিন মুমু
সামান্য তেলে অল্প আঁচে মাছ ১-২ মিনিট ভেজে উঠিয়ে নিতে হবে। পরবর্তীতে ফ্রাই প্যানে তেল দিয়ে একে একে পেয়াজ কুঁচি, কাঁচা মরিচ, হলুদ এবং লবণ দিয়ে কিছুক্ষণ ভেজে নিতে হবে৷ এরপরে মাছ দিয়ে আরও কিছুটা সময় ভেজে চুলা বন্ধ করে ধনিয়াপাতা দিয়ে মিশিয়ে নিলেই খুব অল্প সময়ে তৈরি হয়ে যাবে স্বাস্থ্যকর কাচকি মাছের চচ্চড়ি।.....
বিস্তারিত

শিঙাড়া কি আসলেই খারাপ?

পুষ্টিবিদ মোঃ ইকবাল হোসেন,পুষ্টি কর্মকর্তা
মানুষ খাদ্যে বৈচিত্র্য আনতে খুব পছন্দ করে। একই উপাদানের ভিন্ন ভিন্ন খাবার খেতেও পছন্দ করে। এর মধ্যে হয়তো কিছু খাবার স্বাস্থ্যসম্মত হয়, কিছু খাবার হয় না। আবার কোনো খাবার এতই জনপ্রিয় যে .....
বিস্তারিত

দাম্পত্য জীবন সুখি করবেন কিভাবে??

জিয়ানুর কবির,ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিষ্ট
বর্তমানে প্রাকটিসে প্রায় দম্পতিরা সমস্যা নিয়ে আসেন। কোন সময় একজন এসে তার সঙ্গীর সমস্যা বলতে থাকেন। আবার কখনো দুজনই একসাথে আসেন।.....
বিস্তারিত

খালিপেটে নাকি ভরাপেটে খাবেন ঔষধ!!

ডা. মুহম্মদ মুহিদুল ইসলাম,সায়েন্টিফিক অফিসার
আজকাল অনেক চিকিৎসক ই আছেন রোগী কে সুন্দর করে প্রেস্ক্রিপশন বুঝিয়ে বলে দেন।এতে রোগী যেমন রোগ সম্পর্কে সচেতন হয় তেমনি ঔষধ গুলো বুঝে নিলে চিকিৎসক এর নির্দেশনা মেনে খেতে পারে।....
বিস্তারিত