Royalbangla
ডাঃ গুলজার হোসেন
ডাঃ গুলজার হোসেন

ডেংগি ও প্লেইটলেট(ডেংগু নিয়ে কিছু ভ্রান্ত আতঙ্ক)

টিপস

ডেংগি আবার হানা দিয়েছে। বেশ কজন মারা গেছেন সম্প্রতি। অনেক কনফিউশন আছে ডেংগি নিয়ে। সাধারণ মানু্ষ এবং ডাক্তার উভয় পক্ষেই আছে কিছু ভুল জানাজানি। ডেংগি রোগে প্লেইটলেট কাউন্ট এবং এর ট্রান্সফিউশন নিয়ে রোগীরা আতংক ও নানারকম বিভ্রান্তিতে ভুগতে থাকে। সমস্যা হচ্ছে শুধু রোগী না বড় বড় ডাক্তাররাও এই প্লেইটলেট কমে যাওয়া নিয়ে বিরাট আতংকে ভুগতে থাকেন। রোগীদেরও আতংকিত করেন। প্লেইটলেট কি, তার কাজ কি, কিভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে ঠিক মত মাথা খাটালে এই আতংকটা থাকার কথা ছিলনা। কেউ কেউ প্রোফাইলেকটিক(আগাম সতর্কতা মূলক) প্লেইটলেট দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। এজন্য তারা কিছু নিজস্ব যুক্তিও তৈরি করেন।

যেমন :

১. রুগী খারাপ হয়ে গেল তারপর প্লেইটলেট দিব?

২. যখন প্রয়োজন পড়বে তখন তো রেডি করতে করতে দেরি হয়ে যাবে। রোগী যদি খারাপ হয়ে যায় ততক্ষণে!

৩. বাড়ায়ে রাখলাম, ক্ষতি তো নাই।

এগুলো মূলত মন গড়া, আতংকপ্রসূত এবং স্যরি টু সে, বিষয়টি অনেকখানি অজ্ঞতা প্রসূত।

১ .নম্বরের উত্তর হলো আপনি কখন প্লেইটলেট দেবেন তার একটা গাইডলাইন আছে। রক্ত ক্ষরণের চিহ্ন দেখা দিলে এবং প্লেইটলেট কাউন্ট বিশ হাজারের নিচে নামলে তবেই প্লেইটলেট দেবার কথা ভাবতে পারেন।

২. প্লেইটলেট কমে যাওয়া (থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া) কোন মেডিকেল ইমারজেন্সি না। মানে প্লেইটলেট কমে যাওয়া মাত্র রোগী রক্তক্ষরণ হয়ে ঠাস করে মরে যাবে এরকমও না। সময় পাবেন। প্লেইটলেট কমলে মূলত একধরণের মাইনর ক্যপিলারি ব্লিডিং হয়। ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ বা এইসব।

৩ নম্বর পয়েন্টটা ছিল বাড়ায়ে রাখলাম ক্ষতি তো নাই

উত্তর, অবশ্যই ক্ষতি আছে। আপনি অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিলেন। একেতো ডেংগি শক সিন্ড্রোমের আশংকা, তার উপর এই ট্রান্সফিউশন দিয়ে আপনি রোগীর কম্পলিমেন্ট সিস্টেমকে আরো উত্তেজিত করে তুললেন।সুতরাং বুঝতেই পারছেন খুব প্রয়োজন ছাড়া এই জিনিস দেয়া মূলত বাড়তি কিছু ঝুঁকি নেয়া।

কথা আরো আছে, আপনি এই এক ইউনিট আগাম প্লেইটলেইট দিয়ে কি এমন উদ্ধার করবেন?

প্লেইটলেট উৎপাদন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা প্রতি নিয়ত তৈরি হচ্ছে এবং ভাংছে। আপনার এই আগাম পাঁচ দশ হাজার প্লেইটলেট যোগ করা আর না করা প্রায় সমান কথা৷ ইনফেকশন হতে পারে এই ভেবে আগাম এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেয়াটা যেই মাপের অপচিকিৎসা এটাও সেই মাপের অপচিকিৎসা।

কখন দেবেন?

প্লেইটলেট তখনই দেবেন যখন রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা দেবে শরীরে। র‍্যাশ হবে, রক্তক্ষরণ হবে কেবল তখনই দিতে পারেন প্লেইটলেট। আর রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখলেই আতংকিত হবেন না৷ এইটুকু রক্তক্ষরণে কিছু হবেনা। রক্তক্ষরণের চিহ্ন নেই কিন্তু প্লেইটলেট দশ হাজার বা তার নিচে৷ তাহলেও প্লেইটলেট দিতে পারেন। সেটা বিশেষ পরিস্থিতি। ডেংগিতে প্লেইটলেট আসলে খুব রেয়ারলি দিতে হয়। আর সিদ্ধান্তটিও নেবে আপনার ডাক্তার৷ ডেংগিতে প্লেইটলেট দেওয়াটা কোন চিকিৎসা না। এটা বারবার দেখবারও কোন প্রয়োজন নেই৷ এটা দেখে রোগের মাত্রাও বুঝা যায়না। প্লেইটলেট পর্যাপ্ত থাকার পরও রোগী খারাপ হতে পারে। মরেও যেতে পারে৷

ডেংগিতে তাহলে মানুষ মারা যায় কেন?

ডিয়ার friends, ডেংগিতে প্লেইটলেট কমে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী মারা যায় ব্যপারটা এমন না। রোগী মারা যায় ডেংগি শক সিন্ড্রোমে। সেটা ভিন্ন বিষয়। এর ম্যানেজমেন্ট ভিন্ন। বিস্তারিত কথা আছে।সব বলতে গেলে সেমিনার হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলি। ডেংগিতে ভাইরাসের কারণে রক্তনালীগুলো আক্রান্ত হয়। রক্তনালীর গায়ে যে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে সেগুলো বড় হয়ে যায়। তা দিয়ে রক্তের জলীয় উপাদান বা রক্তরস বের হয়ে আসে। তখন ব্লাড প্রেসার কমতে থাকে। এটা ঠেকাতে রোগীকে ফ্লুইড বা তরল দিতে হবে প্রচুর। মুখে খাওয়ান, শিরাতে দিন। ফ্লুইড, ফ্লুইড এন্ড ফ্লুইড। ঘন ঘন প্লেইটলেট না দেখে ব্লাড প্রেসার কমছে কিনা দেখুন, ডিহাইড্রেশন আছে কিনা দেখুন, রক্তের পিসিভি বা হেমাটোক্রিট দেখুন।হতাশার কথা- এমনকি বড় বড় ডাক্তাররাও এসব গনায় না ধরে ত্রিশ হাজার প্লেইটলেট দেখে ভয়ে আতংকে ছয় ঘন্টা পর পর প্লেইটলেট চেক করে রোগীকে আরো আতংকগ্রস্ত করেন, নিজের চোখখে দেখেছি, প্রেসারের খোঁজও নেননা। হিমাটোক্রিট তো নাই৷ ভাবটা এমন যেন প্লেইটলেট নিরবে নিভৃতে কমে গিয়ে রোগীর হঠাৎ করে হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে।

মোদ্দা কথা: ডেংগিতে প্লেইটলেট এর পেছনে অহেতুক সময় নষ্ট না করে রোগীর ফ্লুইড কারেকশন করুন, প্রেসার দেখুন, প্যারাসিটামল খাওয়ান। অযথা এন্টিবায়োটিক আর প্লেইটলেট দেবেননা।

ডাক্তার বন্ধুদের জন্য বলছি ঃ

চিকিৎসা এবং মনিটরিং এর ক্ষেত্রে হেমাটোক্রিট ভ্যালু ও রক্তচাপকে গুরুত্ব দিন। শিরায় নরমাল স্যালাইন দিন। প্লাজমা, ক্রাইওপ্রিসিপিটেট বা ব্লাড প্রোডাক্ট দিয়ে রোগীকে ভারাক্রান্ত করবেন না৷ হিমাটোক্রিট বেড়ে গেলে এবং রোগী শকে গেলে তবেই কলয়েড সলিউশন দেবেন নয়ত নরমাল স্যালাইন। ডেংগির ন্যাশনাল গাইডলাইনটি ফলো করুন। বাংলাদেশে ডেংগি রোগেরা বেশির ভাগ মরে যায় অতিচিকিৎসায়৷

লেখক

ডাঃ গুলজার হোসেন
বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
চেম্বারঃ
বি আর বি হাসপাতাল পান্থপথ, ঢাকা।
www.facebook.com/gulzarhematologist

  1. royalbangla.com এ আপনার লেখা বা মতামত বা পরামর্শ পাঠাতে পারেন এই এ‌্যড্রেসে royal_bangla@yahoo.com
পরবর্তী পোস্ট

রাইনোপ্লাস্টি (Rhinoplasty) নাকের সৌন্দর্য বর্ধনের সার্জারি।


.

আপনি কি নিজের অজান্তে আয়রন এর অভাবে ভুগছেন ?


পুষ্টিবিদ জয়তী মুখার্জী
.

থ‌্যালাসেমিয়া কি ? কেন হয় ?


ডাঃ সাঈদ সুজন
.

রক্ত কখন কেন কিভাবে দিবেন?


ডাঃ সাঈদ সুজন
.

রক্তদানের ১০টি উপকারিতা যা জানলে আপনি অবাক হবেন


ডা ফাতেমা জোহরা
.

রক্তশূণ্যতা কী? কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার।


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

প্রসংগ:ব্লাড ক্যান্সার-প্রাথমিক ধারনা ও করণীয়


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

রক্তদান ও রক্তপরিসঞ্চালন নিয়ে কিছু কথা


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

ডেংগি ও প্লেইটলেট(ডেংগু নিয়ে কিছু ভ্রান্ত আতঙ্ক)


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

আসুন থ্যালাসেমিয়াকে জানি


ডাঃ গুলজার হোসেন
.

বাবার জন্য সন্তানের রক্ত কতটুকু নিরাপদ?


ডাঃ গুলজার হোসেন,বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল

গর্ভাবস্থায় ঝুকি

পুষ্টিবিদ মোঃ ইকবাল হোসেন,পুষ্টি কর্মকর্তা
প্রতিটি মেয়ের বুকের মাঝে লালিত স্বপ্নগুলোর মাঝে অন্যতম একটি স্বপ্ন হচ্ছে মা হওয়া। সুস্থ্য স্বাভাবিক মাতৃত্ব আমাদের সবার কাম্য। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু জটিলতা দেখা দেয় যা.....
বিস্তারিত

এনোমালি স্ক্যানে সমস্যা ধরা পড়লে করণীয় কি?

ডাঃ সরওয়াত আফরিনা আক্তার (রুমা),Consultant Sonologist
এনোমালি স্ক্যানের মাধ্যমে অধিকাংশ মেজর জন্মগত ত্রুটি ধরা পড়ার কথা যদি ভাল মেশিন ও দক্ষ সনোলজিস্ট দিয়ে করানো হয়। ধরুন কারো এনোমালি স্ক্যানের রিপোর্টে.....
বিস্তারিত

পুরুষ বন্ধ্যাত্ব, প্রয়োজন চিকিৎসার

ডাঃ হাসনা হোসেন আখী,এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য),এমএস (অবস এন্ড গাইনী)
কোভিড আবহে দীর্ঘদিন গৃহবন্দি থাকার সময় বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিল যে সন্তান উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পাবে । কিন্তু হিসাব অনুযায়ী দেশে সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।....
বিস্তারিত

ডালিম বা বেদানায় কতখানি আয়রন?

ডাঃ গুলজার হোসেন ,বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট
বেদানার রঙ লাল দেখে অনেকেই ভাবেন রক্ত বুঝি এখানেই। বাস্তবতা হলো বেদানায় আয়রন আছে ঠিকই কিন্তু সেটা আয়রনের বেস্ট সোর্স নয়। একশ গ্রাম বেদানায় আয়রন থাকে ০.৩ মিলি গ্রাম।......
বিস্তারিত

সুস্থতায় নিয়মানুবর্তিতা: যেসব নিয়ম মেনে চললে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়


পুষ্টিবিদ মুনিয়া মৌরিন মুমু

বাচ্চার আদর্শ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে যা করা উচিত এবং যা করা উচিত নয়


নিউট্রিশনিস্ট সুমাইয়া সিরাজী,Bsc (Hon's) Msc (food & Nutrition)

ব্রেস্ট ফিডিং মায়েদের ডায়েট কেমন হওয়া উচিত?


নিউট্রিশনিস্ট সুমাইয়া সিরাজী,Bsc (Hon's) Msc (food & Nutrition)

লিম্ফোমাঃ রক্তের বিশেষ একপ্রকারের ক্যান্সার


ডাঃ গুলজার হোসেন ,বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট

রক্তের অসুখ পলিসাইথেমিয়া


ডাঃ গুলজার হোসেন ,বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট

ভ্যারিকোসিল কি? কাদের হয়? কি করণীয়?


ডাঃ মোঃ মাজেদুল ইসলাম,এমবিবিএস, এফসিপিএস (সার্জারি),জেনারেল, কোলোরেক্টাল এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন।